এপ কাদের বলা হয় ?
উত্তর : - এপ
(Ape) বলতে
এমন একদল উচ্চস্তরের স্তন্যপায়ী প্রাণীকে বোঝানো হয়, যারা বানরের মতো হলেও তাদের লেজ থাকে না এবং শারীরিক ও মানসিক গঠনে মানুষের সঙ্গে অনেকটা মিল রয়েছে।
আদিম মানুষের উৎপত্তি ও বিবর্তন
“আদিম”
কথার অর্থ হলো খুব পুরোনো বা শুরু কালের। তাই বহু লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে বসবাসকারী প্রথম দিকের মানুষকে আদিম মানুষ বলা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পুরোনো আদিম মানুষের সন্ধান পাওয়া গেছে পূর্ব আফ্রিকায়। বিজ্ঞানীরা তাদের অবশিষ্টাংশ (ফসিল) ও মস্তিষ্কের আকার বিশ্লেষণ করে আদিম মানুষকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করেছেন।
১. অস্ট্রালোপিথেকাস : এপ থেকে মানুষে রূপান্তরের প্রথম ধাপ
সময়কাল : ৪০ লক্ষ → ৩০ লক্ষ বছর আগে
·
এরা ছিল আধা-মানব আধা-এপ ধরনের প্রাণী।
·
প্রথমবারের মতো দু-পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে এবং হাঁটতে চেষ্টা করত।
·
শক্ত বাদাম, ফলমূল, ঘাসজাতীয় খাবার খেত।
·
চোয়াল ও দাঁত ছিল খুব শক্ত, কারণ শক্ত খাবার চিবিয়ে খেতে হতো।
·
গাছের ডাল দিয়ে ধাক্কা মারত বা পাথর ছুঁড়ে মারার চেষ্টা করত—এটাই তাদের আচরণে প্রথম “সরল যন্ত্র ব্যবহারের” ইঙ্গিত।
·
এদের মস্তিষ্কের আকার ছিল মানুষের তুলনায় অনেক ছোট।
২. হোমো হাবিলিস : দক্ষ মানুষ
সময়কাল : ২৬ লক্ষ → ১৭ লক্ষ বছর আগে
·
আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে দক্ষ (Handy
man)।
·
দলবদ্ধভাবে বাঁচত ও একসঙ্গে খাদ্য সংগ্রহ করত।
·
ফল, কন্দমূলের পাশাপাশি সম্ভবত কাঁচা মাংসও খেত।
·
এরা প্রথম দুইটি পাথরকে আঘাত করে ধারালো পাথরের অস্ত্র তৈরি করেছিল।
·
পাথরের সরল হাতিয়ার তৈরিতে দক্ষতাই তাদের নামের উৎস।
৩. হোমো ইরেকটাস : সোজা হয়ে দাঁড়ানো মানুষ
সময়কাল : ২০ লক্ষ → ৩ লক্ষ ৫০ হাজার বছর আগে
·
এরা সম্পূর্ণভাবে সোজা হয়ে দু-পায়ে হাঁটতে পারত।
·
গুহায় বা খোলা জায়গায় দলবদ্ধভাবে থাকত।
·
শিকার করতে পারত এবং দূর-দূরান্তে ভ্রমণ করত।
·
এদের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার ছিল আগুনের ব্যবহার—আলো, উষ্ণতা ও খাদ্য রান্নার জন্য।
·
স্তরকাটা নুড়ি পাথরের হাতিয়ার, পরে হাতকুঠার তৈরি করেছিল।
·
আফ্রিকা থেকে এরা এশিয়া ও ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল।
৪. হোমো স্যাপিয়েন্স : আধুনিক বুদ্ধিমান মানুষ
সময়কাল : ২ লক্ষ ৩০ হাজার বছর আগে থেকে (আমরাই হোমো স্যাপিয়েন্স)
·
শিকার করতে দলবদ্ধভাবে বড় পশু ধরত।
·
আগুন ব্যবহার করে মাংস পুড়িয়ে খেত—যা তাদের স্বাস্থ্য উন্নত করে।
·
পশুর চামড়া সেলাই করে পোশাক তৈরি করত।
·
তীক্ষ্ণ, ধারালো ছোট পাথরের অস্ত্র এবং বর্শা জাতীয় অস্ত্র বানাতে পারত।
·
গুহাচিত্র, নকশা, প্রতীকচিহ্ন আঁকতে পারত—যা প্রথম শিল্পচর্চার প্রমাণ।
·
ধীরে ধীরে ভাষার বিকাশ, সমাজব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাস গড়ে ওঠে।
পাথরের যুগ ও তার তিনটি পর্ব
লক্ষ লক্ষ বছর ধরে আদিম মানুষ পাথর দিয়ে হাতিয়ার ও অস্ত্র তৈরি করত। মানুষের ইতিহাসের বিশাল সময় জুড়ে এই কারণে সময়টিকে বলা হয় পাথরের যুগ (Stone
Age)। পাথরের হাতিয়ারের গঠন, আকার ও ব্যবহার পরিবর্তনের ভিত্তিতে পাথরের যুগকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। প্রতিটি পর্যায়েই মানুষের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, বাসস্থান ও প্রযুক্তিতে বড় পরিবর্তন দেখা যায়।
১. পুরোনো পাথরের যুগ (Palaeolithic
Age)
সময়কাল : আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২০ লক্ষ বছর → খ্রিস্টপূর্ব ১০ হাজার বছর
·
হাতিয়ার ছিল বড়, ভারী ও এবড়োখেবড়ো।
·
এই হাতিয়ারগুলো মূলত শিকার ও ফলমূল সংগ্রহে ব্যবহার করা হতো।
·
মানুষ তখন শিকার করে ও বন থেকে ফলমূল সংগ্রহ করে জীবনধারণ করত।
·
স্থায়ী বাড়ি ছিল না—খোলা আকাশের নিচে বা গুহায় আশ্রয় নিত।
·
জীবন ছিল সম্পূর্ণ যাযাবর।
২. মাঝের পাথরের যুগ (Mesolithic
Age)
সময়কাল : খ্রিস্টপূর্ব ১০ হাজার বছর → খ্রিস্টপূর্ব ৮ হাজার বছর
·
হাতিয়ারের আকার ছোট ও হালকা কিন্তু ধারালো ছিল।
·
শিকার ও ফলমূল সংগ্রহের পাশাপাশি পশুপালন শুরু হয়।
·
মানুষ ধীরে ধীরে যাযাবর জীবনছাড়া শুরু করে।
·
কখনও গুহায়, কখনও খোলা জায়গায় অস্থায়ী বসতি বানাত।
·
এই সময়কার জীবনে স্থিরতা আসতে শুরু করে।
৩. নতুন পাথরের যুগ (Neolithic
Age)
সময়কাল : খ্রিস্টপূর্ব ৮ হাজার বছর → খ্রিস্টপূর্ব ৪ হাজার বছর
·
হাতিয়ার আরও হালকা, উন্নত, ধারালো ও মসৃণ হয়ে ওঠে।
·
কৃষিকাজ শুরু হয়—মানুষ ফসল ফলাতে শেখে।
·
পশুপালন আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
·
মানুষ স্থায়ী বসতি গড়ে তুলতে শুরু করে।
·
মাটির পাত্র বানানো শুরু হয়, যা খাদ্য সংরক্ষণে ব্যবহার হত।
·
সমাজব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি হতে থাকে।
আগুনের আবিষ্কার : মানুষের ইতিহাসে এক বিশাল পরিবর্তন
আগুন ব্যবহার করতে শেখা মানুষের ইতিহাসে অন্যতম বড় ঘটনা। অন্য সব প্রাণী আগুনকে ভয় পায়, কিন্তু মানুষই একমাত্র প্রাণী যে—
·
আগুন জ্বালাতে পারে,
·
আগুনকে নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার করতে পারে।
প্রথমদিকে মানুষ প্রাকৃতিক আগুন—যেমন দাবানল বা বজ্রপাতের আগুন—দেখত ও চেষ্টা করত তা ধরে রাখতে। হয়তো জ্বলন্ত ডাল এনে গুহায় আগুন জ্বালিয়ে রাখত এবং নিভতে দিত না। এক সময় মানুষ নিজেই আগুন জ্বালানোর কৌশল শিখে ফেলে।
আগুন জ্বালানোর দুইটি সম্ভাব্য প্রাচীন পদ্ধতি—
·
চকমকি পাথর পরস্পর আঘাত করলে স্ফুলিঙ্গ থেকে আগুন জ্বলা।
·
কাঠে কাঠ ঘষে আগুন তৈরি করা।
আগুন মানুষের জীবন বদলে দেয়—উষ্ণতা, আলো, নিরাপত্তা, শিকারি প্রাণীর হাত থেকে রক্ষা এবং রান্না করা খাবার—সবই আগুনের অবদান।
লুসি – আদিম মানুষের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধান
আফ্রিকা মহাদেশের ইথিওপিয়ার হাদার (Hadar)
নামের একটি স্থানে ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানীরা অস্ট্রালোপিথেকাস প্রজাতির মানুষের একটি কঙ্কালের গুরুত্বপূর্ণ অংশ খুঁজে পান। এটি ছিল প্রায় ৩২ লক্ষ বছর আগের একটি ছোট মেয়ের দেহাবশেষ। পরে এই কঙ্কালের নাম রাখা হয় “লুসি”।
লুসির আবিষ্কার মানুষের বিবর্তন ইতিহাসে এক বড় পদক্ষেপ। কারণ—
·
লুসির মস্তিষ্কের আকার অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় বড় ছিল।
·
তার শরীরের গঠন দেখে বোঝা যায় যে সে দু-পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে পারত।
·
অস্ট্রালোপিথেকাস প্রজাতির মানুষ থেকে ধীরে ধীরে মানুষের মস্তিষ্ক আরও বড় এবং গঠন আরও উন্নত হতে শুরু করে।
আগুনের ব্যবহারের ফলে পরিবর্তন
·
আগুন ব্যবহার করতে শেখার পর আদিম মানুষের জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।
·
আগুন প্রচণ্ড শীত থেকে মানুষকে রক্ষা করত।
·
বাঘ, নেকড়ে, ভালুকের মতো হিংস্র প্রাণীর আক্রমণ ঠেকাতে আগুন ব্যবহার করা হতো।
·
আগুন মানুষের খাদ্যাভ্যাস সম্পূর্ণ বদলে দেয়। আগে খাবার কাঁচা খেত, কিন্তু আগুন আবিষ্কারের পর খাবার ঝলসে বা সেঁকে খাওয়া শুরু করে।
·
রান্না করা নরম খাবার চিবোতে চোয়াল ও দাঁতের জোর কম লাগত, ফলে ধীরে ধীরে—
1. চোয়াল সরু হয়ে আসে,
2. সামনের ধারালো দাঁত ছোট হয়ে যায়,
3. মুখমণ্ডলের গঠনে পরিবর্তন ঘটে।
·
রান্না করা খাবার হজমে সহজ হওয়ায় শরীরের শক্তি বৃদ্ধি পায়, এবং ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটে।
·
আগুনের আলো মানুষের জীবনকে রাতেও সক্রিয় হতে সাহায্য করে।
ভারতীয় উপমহাদেশে আদিম মানুষ : হাতিয়ার ও জীবনযাপন
আফ্রিকা, চীন ও জাভায় খুব পুরোনো মানুষের কঙ্কাল পাওয়া গেলেও ভারতীয় উপমহাদেশে তত পুরোনো মানব-অবশেষ খুব কম পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয়—
·
আদিম মানুষ আফ্রিকা থেকেই উপমহাদেশে এসেছিল।
·
এখানে মানুষের হাড় বা কঙ্কাল খুব কম পাওয়া গেলেও বিভিন্ন পাথরের হাতিয়ার পাওয়া গেছে, যেগুলো দেখে তাদের জীবনযাপন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
ভারতীয় উপমহাদেশে পুরোনো পাথরের যুগ
পুরোনো পাথরের যুগের প্রধান প্রত্নস্থল
উপমহাদেশে পাওয়া সবচেয়ে পুরোনো পাথরের হাতিয়ার নিম্নলিখিত অঞ্চলে আবিষ্কার হয়েছে—
·
কাশ্মীরের সোয়ান উপত্যকা
·
পাকিস্তানের পটোয়ার মালভূমি
·
হিমাচল প্রদেশের শিবালিক পর্বত অঞ্চল
হাতিয়ারের বৈশিষ্ট্য
·
বেশিরভাগ হাতিয়ারই হাতকুঠার (Hand
Axe) এবং চপার জাতীয়।
·
এগুলো ছিল ভারী নুড়ি পাথর কেটে বা ভেঙে তৈরি।
·
ব্যবহার করা হত—
পশু শিকার, মাংস কাটা, কাঠ ভাঙা, ফল বা খাদ্য সংগ্রহের কাজে।
হোমো ইরেকটাসের বিস্তার উপমহাদেশে
উপমহাদেশের বিভিন্ন এলাকায় হোমো ইরেকটাস প্রজাতির মানুষের বসবাসের প্রমাণ পাওয়া গেছে। উল্লেখযোগ্য অঞ্চলগুলো—
·
কর্ণাটকের হুন্সগি উপত্যকা
·
রাজস্থানের দিদওয়ানা
·
মহারাষ্ট্রের নেভাসা
এখানকার প্রত্নস্থানে বিভিন্ন ধরনের পাথরের হাতিয়ার প্রচুর পরিমাণে পাওয়া গেছে।
গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার
মধ্যপ্রদেশের নর্মদা উপত্যকা থেকে প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার বছর আগের মানুষের মাথার খুলি আবিষ্কার হয়েছে—যা ভারতের প্রাচীনতম মানব-অবশেষগুলোর একটি।
পুরোনো পাথরের যুগের জীবনযাপন
·
যারা ভারী পাথরের হাতকুঠার ব্যবহার করত, তারা মূলত শিকার করে এবং বনের ফলমূল সংগ্রহ করে খাবার জোগাড় করত।
·
তারা নিজেরা খাবার রান্না করতে পারত না (আগুনের ব্যবহার তখনও পুরোপুরি জানা ছিল না)।
·
পশুপালন তাদের জীবনে তখনও শুরু হয়নি।
·
জীবন ছিল সম্পূর্ণ চলতি/যাযাবর।
পুরোনো পাথরের যুগে আদিম মানুষের জীবন
পুরোনো পাথরের যুগে আদিম মানুষ শিকার এবং ফলমূল জোগাড় করেই জীবনধারণ করত। তাদের কাছে খাবার সংরক্ষণ বা উৎপাদনের কোনো পদ্ধতি ছিল না। তাই খাদ্যের সন্ধানে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়ানোই ছিল তাদের দৈনন্দিন জীবন। এই কারণে তাদের জীবনকে বলা হয় যাযাবর জীবন।
মানুষ তখন কোনো স্থায়ী বসতি তৈরি করত না।
·
কোথাও যদি প্রাকৃতিক গুহা পেত, তাহলে কিছুদিন সেখানে থাকত।
·
গুহা না পেলে খোলা আকাশের নিচেই রাত্রি যাপন করত।
জীবন ছিল কঠিন ও সংগ্রামের।
·
শীত থেকে বাঁচতে তারা পশুর চামড়া বা গাছের ছাল পরত।
·
দলবেঁধে পশু শিকার করত এবং খাবার মিলেমিশে ভাগ করে খেত।
·
তখনও মানুষ সেলাই বা পোশাক তৈরি করতে শিখেনি।
ভারতীয় উপমহাদেশে কয়েকটি স্থানে এ ধরনের প্রাচীন গুহাবাসের প্রমাণ পাওয়া যায়, যেমন—
·
পাকিস্তানের সাংঘাও,
·
কর্ণাটকের কুর্ণল,
·
এবং মধ্যপ্রদেশের ভীমবেটকা।
ভীমবেটকা
মধ্যপ্রদেশের ভোপাল থেকে কিছুটা দূরে বিন্ধ্যপর্বতের পাদদেশে অবস্থিত ভীমবেটকা একটি বিখ্যাত প্রত্নস্থান। ঘন জঙ্গলের মধ্যে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে এখানে বহু গুহার সন্ধান মেলে।
এই গুহাগুলোর দেয়ালে আদিম মানুষের আঁকা ছবি পাওয়া গেছে।
ছবিগুলোর বৈশিষ্ট্য—
·
বেশিরভাগ ছবিই শিকারের দৃশ্য।
·
চিত্রে দেখা যায় বিভিন্ন বন্য পশু, পাখি, মাছ, কাঠবেড়ালি ইত্যাদি।
·
মানুষকে দেখা যায় একা বা দলবেঁধে শিকার করতে। অনেকের মুখে মুখোশ, হাতে-পায়ে গয়না।
·
কিছু ছবিতে মানুষের সঙ্গে কুকুরও দেখা যায়।
·
ব্যবহৃত রঙের মধ্যে সাদা, লাল, আর কিছু ক্ষেত্রে হলুদ ও সবুজ রঙ লক্ষ্য করা যায়।
ভীমবেটকার গুহাচিত্র থেকে বোঝা যায়—আদিম মানুষ শুধু শিকার করতই না, বরং তাদের সংস্কৃতি ও শিল্পবোধও ছিল।
হুন্সগি উপত্যকা
কর্ণাটকের গুলবর্গা জেলার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত হুন্সগি উপত্যকা, যার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কাথটা হাল্লা নামের একটি ছোট খাল। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে এখানে মাটি খুঁড়ে বহু পুরোনো পাথরের যুগের হাতিয়ার আবিষ্কৃত হয়।
হাতিয়ারের বৈশিষ্ট্য—
·
এগুলো প্রায় পাঁচ থেকে ছয় লক্ষ বছর আগেকার।
·
বেশিরভাগই হাতকুঠার, ছোরা, চাঁছুনি ইত্যাদি।
·
হুন্সগিতে মানুষ নিজেরাই পাথরের হাতিয়ার তৈরি করত।
হুন্সগি উপত্যকা আদিম মানুষের বসতির জন্য উপযুক্ত ছিল, কারণ—
·
কাছেই ছিল খালের পরিষ্কার জল,
·
ছিল বিভিন্ন ধরনের বন্যজন্তু,
·
গাছপালা ও খাদ্যের জন্য উপাদানও সহজেই পাওয়া যেত।
এইসব সুবিধার কারণেই আদিম মানুষ ওই অঞ্চলটি বসতির জন্য বেছে নিয়েছিল বলে মনে করা হয়।
ট্যরো-ট্যরো
ইউরোপের স্পেনে আলতামিরা নামে একটি পাহাড়ি অঞ্চলে কিছু প্রাচীন গুহার সন্ধান পাওয়া যায়। এক প্রত্নতাত্ত্বিক তাঁর ছোট মেয়েকে নিয়ে সে গুহাগুলি দেখতে গিয়েছিলেন। তাঁর হাতে ছিল একটি আলো। হঠাৎ মেয়েটি গুহার ছাদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল—
“ট্যুরো-ট্যুরো!”
অর্থাৎ “ষাঁড়-ষাঁড়!”
দেখা গেল গুহার ছাদে আঁকা রয়েছে প্রায় ৫০–৩০ হাজার বছর আগেকার গুহাবাসী মানুষের তৈরি এক বিশাল ষাঁড়ের ছবি। আলতামিরার এই শিল্প মানুষের প্রাচীন সৃজনশীলতার এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
পুরোনো পাথরের যুগে হাতিয়ার তৈরির পরিবর্তন
পুরোনো পাথরের যুগে হাতিয়ার তৈরির পদ্ধতি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে—
·
হাতিয়ারগুলো আগের তুলনায় হালকা, ছোট ও ধারালো হয়ে ওঠে।
·
বড় পাথরে আঘাত করে তার ছোট কোনাচে অংশগুলো বিচ্ছিন্ন করা হতো, আর সেগুলোকেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
·
ফলে ভারী নুড়ি পাথরের হাতিয়ারের ব্যবহার কমতে থাকে।
হাতিয়ার তৈরির এই পরিবর্তনের ভিত্তিতেই পুরোনো পাথরের যুগের বিভিন্ন উপপর্ব আলাদা করে দেখা হয়। এই সময়ে ছুরি ছিল একটি প্রধান হাতিয়ার, এবং পুরোনো পাথরের যুগের শেষ পর্যন্ত এই ধরনের ছুরির ব্যবহার বজায় ছিল।
উপমহাদেশের মাঝের পাথরের যুগ
মাঝের পাথরের যুগে হাতিয়ার প্রযুক্তি আরও উন্নত হয়।
এই সময়ের বৈশিষ্ট্য
·
ছুরিগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি ধারালো ও ছোট হয়, যেগুলোকে বলা হয় ছোট পাথরের হাতিয়ার।
·
আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব দশ হাজার অব্দে উপমহাদেশের আবহাওয়া ক্রমে গরম হতে থাকে, যা মানুষের বসবাসের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে।
·
ছোট পাথরের হাতিয়ারগুলো গাছের ডালে গেঁথে ব্যবহার করা হতো, যাতে ধরতে সুবিধা হতো।
হাতিয়ারের সন্ধান কোথায়?
·
উত্তরপ্রদেশের মহাদহা
·
মধ্যপ্রদেশের আদমগড়
এছাড়া উত্তরপ্রদেশের সরাই নহর রাই-এ দু-দিকে ধারওলা ছুরি ও হাড়ের তৈরি তিরের ফলাও পাওয়া গেছে। সেখানে বিভিন্ন বন্য প্রাণীর হাড় পাওয়া গেলেও ভেড়া বা ছাগলের মতো গৃহপালিত প্রাণীর হাড় মেলে না, তাই ধারণা করা হয়—
সে সময় মানুষ এখনো এসব পশুকে পোষ মানায়নি।
আদিম মানুষের খাদ্য, হাতিয়ার ও জীবনযাপন
আদিম মানুষ তখনও শিকারি ছিল।
সরাই নহর রাই অঞ্চলে জাঁতার মতো যন্ত্র পাওয়া গেছে। এই জাঁতা ব্যবহার করে তারা শস্যদানা গুঁড়ো করত, তবে শস্য তারা নিজেরা উৎপাদন করত না—বনের শস্য সংগ্রহ করে জাঁতায় পিষত।
এখানে আদিম মানুষের সমাধি ও কঙ্কালও পাওয়া গেছে।
মহাদহা অঞ্চলেও সমাধি পাওয়া গেছে। সেখানকার কঙ্কাল দেখে বোঝা যায়—মানুষরা প্রায়ই কম বয়সেই মারা যেত।
আদমগড়ের মানুষের জীবনধারা
·
নর্মদা উপত্যকার আদমগড়ে প্রায় ৮,০০০ বছর পুরোনো বন্য পশুর হাড় পাওয়া গেছে।
·
এর সঙ্গে গবাদি পশু ও কুকুরের হাড়ও পাওয়া যায়।
·
গবাদি পশু ও কুকুরের হাড়ে আঘাতের চিহ্ন নেই, অর্থাৎ তাদের হত্যা করা হয়নি।
·
এর থেকে বোঝা যায়, তারা পশুপালন করত।
·
তবে তারা শিকার করেও খাদ্য সংগ্রহ করত।
·
পশুপালনের ফলে মানুষ দুধ ও খাবার পেত বেশি পরিমাণে।
·
এসব সংরক্ষণের জন্য দরকার ছিল পাত্র।
·
সম্ভবত তারা ঝুড়ির ভিতরে মাটি ঢেলে বা হাত দিয়ে লেপে মাটির পাত্র বানাত।
·
তখনো কুমোরের চাক আবিষ্কার হয়নি।
বাগোড়
·
রাজস্থানের বাগোড়ে আদিম মানুষের বসতির চিহ্ন পাওয়া গেছে।
·
প্রথমদিকে বাগোড়ের মানুষ শিকার করেই খাবার জোগাড় করত।
·
কিছুটা পশুপালনও জানত।
·
প্রচুর পশুর হাড় পাওয়া গেছে, যেখান থেকে বোঝা যায়—সময়ের সঙ্গে গৃহপালিত পশুর সংখ্যা বাড়তে থাকে, আর শিকার করা পশুর সংখ্যা কমে যায়।
অর্থাৎ বাগোড়ে শিকার ও পশুপালন—দুই-ই চলত।
উপমহাদেশে নতুন পাথরের যুগ (Neolithic
Age)
নতুন পাথরের যুগে মানবজীবনে বড় পরিবর্তন আসে।
এই সময়ের বৈশিষ্ট্য
·
পাথরের হাতিয়ার তৈরির কৌশল অনেক উন্নত হয়।
·
নানা রকম বড় ও ছোট ধারালো হাতিয়ার ব্যবহার করা হতো।
·
এই সময়ে প্রথম মানুষ কৃষিকাজ শেখে।
·
এর ফলে মানুষ নিজেই খাদ্য উৎপাদন শুরু করে।
সমাজজীবন
·
ছেলেরা দল বেঁধে শিকার করতে বা পশু চরাতে যেত।
·
মেয়েরা বাচ্চাদের দেখাশোনা করত।
·
মানুষ ধীরে ধীরে গৃহপালিত পশুর গুরুত্ব বুঝতে পারে।
·
নতুন পাথরের যুগে কৃষির সূচনা ও মানবজীবনের পরিবর্তন
নতুন পাথরের যুগে (Neolithic
Age) মানবজীবনে বিশাল পরিবর্তন আসে।
কৃষির সূচনা
মেয়েরা ফলমূল সংগ্রহ করতে গিয়ে গাছপালা পর্যবেক্ষণ করতে থাকে।
তারা লক্ষ্য করে—
·
বীজ থেকে চারাগাছ জন্মায়,
·
চারাগাছ থেকে বড় গাছ হয়।
এই অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ বুঝতে পারে, বীজ বপন করলেই গাছ জন্মায়, আর এইভাবেই শস্য উৎপাদন করা যায়।
এভাবেই কৃষিকাজের সূচনা ঘটে।
স্থায়ী বসতির শুরু
·
কৃষিকাজ শুরু হওয়ার পর মানুষকে আর শিকার বা পশুপালনের জন্য দূরে দূরে ঘুরতে হত না।
·
কৃষিকাজ নিশ্চিত খাদ্য দেয়, যা শিকারের মতো অনিশ্চিত নয়।
·
তাই মানুষ ক্ষেতের পাশে স্থায়ী বসতি গড়ে তুলতে শুরু করে।
·
“চাষবাস” শব্দটি আজও ব্যবহৃত হয়—যা চাষ ও বাস (থাকা)-র যোগ।
·
কৃষির সঙ্গে সঙ্গে পশুপালনও সহজ হয়ে যায়।
·
কারণ — খড়, বিচালি, শস্যের আবর্জনা গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
·
এর ফলে গৃহপালিত পশুর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।
মানুষের টিকে থাকা ও উন্নতির কারণ
·
অনেক প্রাণী মানুষের চেয়ে শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও আজ বিলুপ্ত—যেমন ডাইনোসর।
·
কিন্তু মানুষ টিকে গেছে এবং উন্নতিও করেছে।
·
এর বড় কারণ মানুষের সংস্কৃতি।
·
দিন-দিন আমরা যে নাচ-গান, পোশাক, শিল্প-সাহিত্যকে সংস্কৃতি বলি—
·
ইতিহাসে ‘সংস্কৃতি’ শব্দের অর্থ আরও বড়:
·
শেখার ক্ষমতা
·
নতুন জিনিস আবিষ্কারের ক্ষমতা
·
জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়া
·
সহযোগিতা ও সামাজিক জীবন
এই ক্ষমতাগুলো মানুষকে অন্যান্য প্রাণীর থেকে আলাদা করেছে এবং টিকে থাকার শক্তি দিয়েছে।
Marks - 2 / 3 / 5
(1) টীকা
লেখো : অস্ট্রালোপিথেকাস
(2) পুরোনো পাথরের যুগ, মাঝারি পাথরের যুগ ও নতুন পাথরের যুগের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করো।
(3) টীকা
লেখো : লুসি
(4) আগুন
জ্বালানো শেখার পরে আদিম মানুষের কী কী সুবিধা হয়েছিল?
(5) আদিম
মানুষের বিবর্তন সংক্ষেপে বর্ণনা করো।
(6) আদিম
মানুষ কেন জোট বেঁধে থাকত? এর ফলে তাদের কী লাভ হতো?
(7) ‘এপ’
কাদের বলে?
(8) ভীমবেটকা কী? এটি কীসের জন্য বিখ্যাত?
(9) ভারতীয় উপমহাদেশে পাথরের যুগকে কয় ভাগে ভাগ করা হয়? কী কী? যে কোনো এক প্রকার পাথরের যুগের জীবনযাপন সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।
(10) উপমহাদেশে নতুন পাথরের যুগের কৃষিকাজ সম্পর্কে লেখো।
(11) বাগোর কী?
(12) আদিম
মানুষ কীভাবে আগুন জ্বালাতে শিখেছিল?
(13) “ট্যারো-ট্যারো” শব্দের অর্থ কী?
(14) দাবানল কি ?
(15) আদিম
মানুষের জীবনযাত্রা কেমন ছিল ?
(16) আদিম
মানুষ যাযাবর ছিল কেন ?
১। সঠিক শব্দটি বেছে নিয়ে শূন্যস্থান পূরণ করো :
১.১) আদিম মানুষ প্রথমে (রান্না করা খাবার/পোড়া মাংস/কাঁচামাংস ও ফলমূল) খেত।
১.২) আদিম মানুষের প্রথম হাতিয়ার ছিল – (ভোঁতা পাথর/ হালকা ছুঁচালো পাথর/ পাথরের কুঠার)।
১.৩) আদিম মানুষের জীবনে প্রথম জরুরি আবিষ্কার — (ধাতু/ ঢাকা/ আগুন)।
২। ক-স্তম্ভের সঙ্গে খ-স্তম্ভ মিলিয়ে লেখো :
ক- স্তম্ভ খ-স্তম্ভ
কৃষিকাজ
মধ্যপ্রদেশ
পশুপালন
নতুন পাথরের যুগ
ভীমবেটকা
মাঝের পাথরের যুগ
হুন্সগি কর্ণাটক
৩। নিজের ভাষায় ভেবে লেখো (তিন/চার লাইন) :
৩.১) আদিম মানুষ যাযাবর ছিল কেন?
৩.২) আগুনে জ্বালাতে শেখার পর আদিম মানুষের কী কী সুবিধা হয়েছিল?
৩.৩) আদিম মানুষ কেন জোট বেঁধেছিল? এর ফলে তার কী লাভ হয়েছিল?

Enter Your Comment