উচ্চমাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা পরীক্ষা ২০২৬ – প্রশ্নপত্র ও সমাধান
West Bengal HS 4th Semester Bengali Question Paper 2026 with Answers
বাংলা - ক ভাষা
SEMESTER – IV (New System), ২০২৬
পূর্ণমান : ৪০ || মোট সময় : ২ ঘণ্টা
◉পরিমিত এবং যথাযথ উত্তরের জন্য বিশেষ মূল্য দেওয়া হবে। বর্ণাশুদ্ধি, অপরিচ্ছন্নতা এবং অপরিষ্কার হস্তাক্ষরের ক্ষেত্রে নম্বর কেটে নেওয়া হবে। উপাত্তে প্রশ্নের পূর্ণমান সূচিত আছে।
নির্দেশাবলি :
এই প্রশ্নপুস্তিকাটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৮।
প্রদত্ত নির্দেশ অনুসারে প্রশ্নের উত্তর দাও। মূল উত্তরপত্রেই কেবল প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, অন্যত্র নয়।
This Question Booklet is sealed by Reverse Jacket. The candidate has to cut the jacket to open the booklet shown on the opening side of the Question Booklet. Candidate may use scale to cut open the jacket.
WBCHSE 4th Semester Bengali Question Paper 2026 Download
বিভাগ – ক
(৫ অথবা ২+৩ নম্বরের প্রশ্ন) 6 x 5 = 30
১। দুটি প্রশ্নের মধ্যে যে-কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও (অনধিক ১৫০ শব্দে) :
(A) মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ‘হলুদ পোড়া’ গল্পের নবীন চরিত্রটি আলোচনা করো।
উত্তর : - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম ছোটোগল্প ‘হলুদ পোড়া’। এই গল্পে গ্রামীণ অজ্ঞতা ও অন্ধবিশ্বাসের ওপর ভর করে ভৌতিক আবহে মানুষের মধ্যে যে বিকারগ্রস্ততা দেখা দেয়, তা লেখক সুনিপুণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। এই গল্পের অন্যতম চরিত্র নবীন; যে, সম্পর্কে খুন হয়ে যাওয়া বলাই চক্রবর্তীর ভাইপো। গল্পের প্রেক্ষাপটে তার চরিত্রের কিছু পরিচয় তুলে ধরা হল-
গ্রাম্য কুসংস্কারের আবর্তে আবর্তিত : নবীন শিক্ষিত, কর্মসূত্রে শহরে থাকলেও গ্রামীণ কুসংস্কারের সাগরে হাবুডুবু খেয়েছে। তার স্ত্রী দামিনীকে যখন অশরীরী আর ভর করেছিল তখন সে ডাক্তার অপেক্ষা ওঝার ওপর বেশি আস্থা প্রকাশ করেছিল। যদিও সে শেষমেশ কৈলাশ ডাক্তারকে ডাকতে পাঠিয়েছিল।
সম্পত্তির প্রতি আকর্ষণ : বলাই চক্রবর্তীর নৃশংস হত্যার পর কাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী ছিল সে, তাই তার দখল নেওয়ার জন্য শিক্ষিত নবীন চল্লিশ টাকা মাহিনার চাকরি ছেড়ে শহর থেকে গ্রামে এসে বসবাস করতে শুরু করে।
ছলনার আশ্রয় : নবীনের চরিত্রের মধ্যে একটা ছলনাকে আশ্রয়ের মাধ্যমে।গ্রামবাসীদের সহানুভূতি আদায় করার চেষ্টা লক্ষ করা গিয়েছে। তার মধ্যে যতটা-না দুঃখ ও প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা ছিল, তার চেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল উপস্থিত গ্রামবাসীদের সামনে মিথ্যা কান্নার অভিনয় করা। তাই সে কখনও কোঁচার কাপড়ের খুঁটে চশমার কাচ মুছতে মুছতে চোখও মুছতে থাকে।
আত্মসম্মানবোধ : নবীনের মধ্যে যথেষ্ট আত্মসম্মানবোধ লক্ষ করা গেছে। সে শুধুমাত্র কাকার বিষয়সম্পত্তির প্রতি যে আগ্রহী ছিল তা নয় বরং লোকলজ্জার ভয়ে কাকার খুনীদের সন্ধান দেওয়ার জন্য পঞ্চাশ টাকা পুরস্কারের কথাও ঘোষণা করে।
এ ছাড়া নবীন চরিত্রটি যে বৈষয়িক; তা বোঝা যায় যখন সে ওঝা কত টাকা নেবে জিজ্ঞেস করে। ছোটোগল্পের ছোটো পরিসরে এইভাবে নবীন চরিত্রটি লেখকের হাতে পড়ে সমকালীন সময়ের সমাজে হয়ে উঠেছিল ভীষণ উচ্ছ্বল একটি চরিত্র।
(B) “অসম্ভব দুশ্চিন্তা হলো গৌরবির।” — গৌরবির পরিচয় দাও। গৌরবির দুশ্চিন্তার কারণ কী? (২+৩)
উত্তর : - মহাশ্বেতা দেবী রচিত ‘হারুন সালেমের মাসি’ ছোটোগল্পের প্রধান তথা কেন্দ্রীয় চরিত্র গৌরবি। গল্পকার আলোচ্য গল্পে নিজস্ব লিখনশৈলীর গুণে মাতৃহৃদয়ের আত্মিক টানকে তুলে ধরেছেন গৌরবি চরিত্রের মধ্য দিয়ে।
মহাশ্বেতা দেবী রচিত ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পে জাতপাতের বিভেদে জর্জরিত গ্রামীণ জীবনে ধর্মনিরপেক্ষ, মাতৃমমতায় পুষ্ট এক না খেতে পাওয়া নারী গৌরবীর মানবিক সংগ্রাম ও সিদ্ধান্ত উচ্চারিত হয়েছে। গৌরবী এই গল্পের মুখ চরিত্র। তার ছেলে নিবারণ তাকে কাছে রাখে না। নিবারণের সেই শূন্যতা পূর্ণ করেছে হারা। গৌরবীর জীবনের সঙ্গে হারা তাই ওতপ্রোতভাবে মিশে গেছে। সেই অনাথ, দুঃখী ছোট্ট হারার জন্য গৌরবীর নানা দুশ্চিন্তা।
দুশ্চিন্তার কারণ: সদ্য মাতৃবিয়োগ হওয়ার পর নিঃসঙ্গ, অসহায় হারা গৌরবীর উঠোনে এসে দাঁড়ায় নিরাপদ আশ্রয়ের আশায়। হারার মার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কসূত্রে গৌরবীকে সে মাসি বলে ডাকে। হারার মা মারা যাওয়ার আগে হারাকে বলে গিয়েছিল, “মাসির পা ধরে পড়ে থাকিস।“ কিন্তু মাসির যে অন্নের সংস্থান নেই, পরের আশ্রয়ে তার বাস। তাই অসহায় হারার জন্য কী করবে বা তাকে কীভাবে আশ্রয় দিয়ে নিজের কাছে রাখবে তা ভেবে পায় না গৌরবী। হারা যে ধর্মে মুসলমান। তাই মুসলমানের ছেলেকে হিন্দুর বাড়িতে রাখলে সমাজ কিছুতেই মেনে নেবে না। সমাজের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে হারাকে যে আশ্রয় দেবে, সে সামর্থ্যও গৌরবীর নেই। নানা দ্বিধা-দোলাচলতায় গৌরবীর মধ্যে নানা দুশ্চিন্তা উপস্থিত হয়। একদিকে হারার প্রতি প্রবল স্নেহ ও মাতৃত্ববোধ, অন্যদিকে সংকীর্ণ মানসিকতার অমানবিক সমাজ-এই দুইয়ের টানাপোড়েনে গৌরবীর দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়।
২। দুটি প্রশ্নের মধ্যে যে-কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও (অনধিক ১৫০ শব্দে) :
(A)
“মধ্যবিত্তমদির জগতে
আমরা বেদনাহীন-অন্তহীন বেদনার পথে।”
- উদ্ধৃত অংশটির তাৎপর্য বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর : - দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে সারা পৃথিবী জুড়ে যে নৈরাজ্যের বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল, যেন তারই প্রতিচ্ছবি ধরা পড়েছিল তেতাল্লিশের মন্বন্তরে। তাই কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন-
"মন্বন্তর শেষ হ'লে পুনরায় নব মন্বন্তর"
একসময় যে স্বর্ণযুগ অস্তিত্বময় ছিল, তা আজ অন্তর্হিত। তার জায়গায় বর্তমানে যেন নেমে এসেছে ধ্বংসের অন্ধকার। বর্তমানে কালের পথে উঠে এসেছে, গা-বাঁচিয়ে চলা মধ্যবিত্ত মানবশ্রেণি। সাধারণ নিম্নবিত্ত মানুষদের সঙ্গে এই মধ্যবিত্তদের মাঝখানের তফাৎটুকু কবি নির্দেশ করেন ‘এরা’-‘ওরা’ শব্দ দুটির প্রয়োগে। মন্বন্তরের দহনদিনে নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষ যখন ক্ষুধায় কাতর, তখনও মধ্যবিত্তশ্রেণি নিছকই বিমর্ষ হয়। কারণ তারা ‘মধ্যবিত্তমদির’। মদিরতা মানে মত্ততা। এই শ্রেণির মানুষেরা আত্মপ্রেমে মজে থাকে, এমতাবস্থায় অন্যকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করার কথা এদের মনে আসে না। কারও কোনো দুরবস্থা এদের সামান্যতম পীড়িতও করে না। কবি একে এক ধরনের মদিরতা বলে ব্যঙ্গ করেছেন। মধ্যবিত্তজনের এই আত্মমত্ত, আবিষ্ট মানসিক অবস্থানকেই কবি এখানে ‘মধ্যবিত্তমদির’ বলে প্রকাশ করেছেন।
অন্তহীন বেদনার পথে-র অর্থ: নিম্নবর্গীয় মানুষজনকে মন্বন্তর উপহার দিয়েছিল- নর্দমা-ফুটপাথ-লঙ্গরখানা। এই পরিস্থিতির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে ভাবলে দেখা যায়- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে বিশ্বজোড়া আর্থিক মন্দা সমাজজীবনে যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল, তাতে মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষজনও তাদের মূল্যবোধ ভুলে গিয়ে হয়ে উঠেছিল স্বার্থকামী, আত্মকেন্দ্রিক ও নিছক সুখে বেঁচে থাকার মন্ত্রে দীক্ষিত। নিম্নবিত্তরা ফুটপাথে ক্ষুধা-যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে মরে যেতে পারে, কিন্তু মধ্যবিত্তরা তা পারে না, কারণ তারা জীবনবিলাসী। আত্মকেন্দ্রিকতা বা স্বার্থপরতায় আক্রান্ত ‘এরা’ সমূহ বিপদ-ঝঞ্ঝা থেকে গা-বাঁচিয়ে আত্মরক্ষা করতে সদা তৎপর। জীবনের নিরাপদ বৃত্ত পরিধি ছুঁয়ে, আত্মসুখে নিমজ্জিত থাকাতে অভ্যস্ত। নগরের পথে-প্রান্তে মৃত্যুর মিছিল, বিঘ্নিত জীবনযাপনের পরিসরে নিরন্নতার হাহাকার, নিছক একটু ‘ফ্যান’-এর জন্য মানুষের ক্ষুধার্ত চিৎকার মধ্যবিত্ত মানুষকে ব্যথিত করে না, বিব্রত করে। তখন সেই ‘অন্তহীন বেদনার পথে’-র থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে মধ্যবিত্ত ‘ভদ্র সাধারণ’ সুখের স্বপ্নে বিভোর হয়। চতুর্দিকের এই বেদনাময় পরিস্থিতিতেও তার আত্মকেন্দ্রিকতার ঘেরাটোপে কোনো আঘাত লাগে না।
(B)
“মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে
বাবা এল।
ছেলে এল না।”
- কবিতাটি কোন্ প্রেক্ষিতে লেখা? ছেলে ঘরে না ফেরার কারণ কী? (২+৩)
৩। দুটি প্রশ্নের মধ্যে যে-কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও (অনধিক ১৫০ শব্দে) :
(A) ‘এই তো জীবনের সত্য কালীনাথ’ — জীবনের সত্য কী? বক্তা কীভাবে এই সত্যে উপনীত হলেন? (২+৩)
উত্তর : - অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নানা রঙের দিন’ একাঙ্ক নাটকে মঞ্চাভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় আটষট্টি বছর বয়সে অভিনয় শেষের এক রাত্রিতে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় প্রম্পটার কালীনাথ সেনের সঙ্গে কথোপকথনকালে এমন উপলব্ধি করেছেন।
জীবনের সত্যের স্বরূপ: অভিনয় জীবনের পঁয়তাল্লিশ বছর অতিক্রম করে তিনি অনুভব করেছেন তাঁর জীবন ক্রমশ এগিয়ে চলেছে সমাপ্তির পথে। যৌবনে তাঁর শরীরে ছিল বল, চেহারায় ছিল জেল্লা, মনে ছিল অফুরন্ত সাহস। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বাভাবিকতা বিনষ্ট হয়েছে। থিয়েটারের প্রতি গভীর ভালোবাসায় একসময় তিনি ত্যাগ করেছিলেন পরিবার, স্বজন, প্রেম, সুনিশ্চিত চাকরি। শিল্পকে আঁকড়ে ধরে তিনি বাঁচতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অনুভব করলেন, বয়সের ছাপ ধীরে ধীরে তাঁর অভিনয়ে পড়ছে। দিন দিন তাঁর খ্যাতি, প্রতিপত্তি কমে যাচ্ছে। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে তাঁর উপলব্ধি, “অভিনেতা মানে একটা চাকর-একটা জোকার, একটা ক্লাউন।“ অভিনেতার সামাজিক কোনো মানমর্যাদা নেই। নাটকওয়ালাদের তাঁর মনে হয়েছে, “একটা ভাঁড় কি মোসায়েবের যা কাজ তাই।”
সত্যের উপলব্ধি: জীবনের সায়াহ্নে উপনীত হয়ে রজনীকান্ত উপলব্ধি করেছেন যে, শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা ও গভীর ভালোবাসা, অভিনয়ে নিষ্ঠাবান, চরিত্রকে হৃদয়ঙ্গম করে তার গভীরে প্রবেশ করতে পারলে ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্ট-বেদনা লঘু হয়ে যায়। তিনি এও বুঝেছেন, তাঁর পঁয়তাল্লিশ বছরের শোকানল, অনুভূত চিতার আঁচ, সমাগত মৃত্যুর নিশ্বাস শিল্পীর প্রতিভার কাছে তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র হয়ে যায়; প্রতিভাই শেষ কথা বলে। দক্ষ অভিনেতা রজনীকান্তের মধ্যে এই প্রতিভার বিচ্ছুরণ আছে। তিনি মনে করেন, প্রতিভাই পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও বয়সকে তুচ্ছ করে দিতে পারে। জীবনের চিরন্তনী শক্তি হল এই প্রতিভা। রজনীকান্ত মনে করেন “প্রতিভা যার আছে, বয়েসে তার কি আসে যায়!” অভিনেতা রজনীকান্তের কাছে এটাই জীবনের চরম সত্য। এই জীবনসত্য তাঁর জীবনীশক্তি। জীবনের নানা অপমান, লাঞ্ছনা, বার্ধক্য-জরা এমনকি মৃত্যুভয়কেও তিনি উপেক্ষা করতে পারেন এই জীবনসত্য দিয়েই।
(B) ‘পুরোনো দিনের কথাটিলে যান চাটুজ্জেমশাই।’ — কোন্ প্রসঙ্গে, কে, কাকে একথা বলেছেন? এ পুরোনো দিনের কথাটি কেন ভুলতে বলা হয়েছে? (২+৩)
৪। চারটি প্রশ্নের মধ্যে যে-কোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও (অনধিক ১৫০ শব্দে) :
(A) “অমন নবীন চোখ তো আমার নেই, তবু তোমার দেখার সঙ্গে সঙ্গে আমিও দেখতে পাচ্ছি।” — কে, কাকে একথা বলেছে? বক্তা কী দেখতে পেয়েছিলেন? (২+৩)
উত্তর : - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকে এই উক্তিটি ঠাকুরদাদা বলেছেন অমলকে।
অমলের কল্পনাশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর ও নবীন। ঠাকুরদাদা বয়স্ক হলেও অমলের কল্পনার জগতে নিজেকেও শামিল করতে পেরেছিলেন। তিনি অমলের সঙ্গে মিলিয়ে—
- রাজার চিঠি কোন পথ দিয়ে আসবে তা কল্পনায় দেখতে পেয়েছিলেন।
- ডাকহরকরা কীভাবে আসছে, তার আগমনের দৃশ্যও অনুভব করেছিলেন।
- এমনকি মোড়লের দেখানো অক্ষরশূন্য সাদা কাগজেও তিনি রাজার চিঠির অক্ষর কল্পনায় দেখতে পেয়েছিলেন।
এভাবে ঠাকুরদাদা প্রমাণ করেন যে তাঁর চোখ নবীন না হলেও তাঁর অন্তরের দৃষ্টি অমলের মতোই উন্মুক্ত ও কল্পনাময়।
(B) “একি উৎপাত। আমি আসি ভাই!” — কে কাকে কথাটি বলেছে? কোন বিষয়টি উৎপাত বলে মনে হয়েছে? (২+৩)
উত্তর : - রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ নাটকের তৃতীয় দৃশ্যে কবিরাজ অমলকে দেখতে এসে তার রোগের লক্ষণ সম্পর্কে মাধবদত্তের সাথে যখন কথা বলছিলেন তখন মোড়লকে আসতে দেখে কবিরাজ এমন কথা বলেন। মোড়লের স্বভাব সম্পর্কে সবাই প্রায় অবগত। তার সাথে ইচ্ছা করে কেউ মুখোমুখি হতে চায় না। সামনাসামনি হলেই সে কোনো-না-কোনো বিষয় নিয়ে ঝগড়া বাধাবে, শত্রুতা করবে। কবিরাজ চান না কারোর সাথে ইচ্ছাকৃত শত্রুতা বাড়াতে, তাই মোড়লের আগমনকে তাঁর উৎপাত বলে মনে হয়েছে।
(C) “বোলো যে, ‘সুধা তোমাকে ভোলে নি।’” — সুধা কেন অমলকে ভোলেনি? এই সূত্রে সুধা চরিত্রটি সংক্ষেপে আলোচনা করো। (৩+২)
উত্তর : - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকে সুধা অমলের সমবয়সী একমাত্র নারীচরিত্র। অমলের সঙ্গে তার সহজ, নির্মল ও আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অমল অসুস্থ ও ঘরবন্দি হলেও সুধার সঙ্গে তার আলাপচারিতায় এক বিশেষ মাধুর্য সৃষ্টি হয়। যাওয়ার সময় সুধা অমলকে একটি ফুল দিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। নাটকের শেষে দেখা যায়, অমল চিরনিদ্রায় শায়িত হলেও সুধা হাতে ফুল নিয়ে আসে এবং বলে— “বোলো যে, সুধা তোমাকে ভোলে নি।”
সুধা অমলকে ভোলেনি কারণ তার মনে অমলের প্রতি ছিল নিষ্কলুষ স্নেহ ও কোমল টান। সে তার দেওয়া কথা রেখেছে। অমলের স্মৃতি তার কাছে অমূল্য হয়ে থেকেছে। এই উক্তির মাধ্যমে বোঝা যায়, মানবীয় প্রেম ও স্মৃতি মৃত্যুকেও অতিক্রম করতে পারে।
সুধা চরিত্রের সংক্ষিপ্ত আলোচনা: সুধা শশী মালিনীর কন্যা, এক সরল ও প্রাণবন্ত বালিকা। তার মধ্যে জাগতিক ব্যস্ততা ও শিশুসুলভ চপলতা থাকলেও সে হৃদয়ে কোমল ও দয়ালু। সে পার্থিব জীবনের প্রতীক হলেও তার মধ্যে মানবীয় প্রেমের সুধা রয়েছে। অমলের প্রতি তার মমতা নাটকে মানবিক রসের সঞ্চার করেছে। সুধা চরিত্রটি ক্ষণিক মর্ত্যপ্রেমের প্রতীক এবং নাটকের করুণ সৌন্দর্যকে গভীর করেছে।
(D) ‘ডাকঘর? কার ডাকঘর?’ — ‘ডাকঘর’ শব্দটির সাধারণ অর্থ কী? রবীন্দ্রনাথ কোন্ তাৎপর্যে ‘ডাকঘর’ নাটকটির নামকরণ করেছেন? (২+৩)
উত্তর : - ডাকঘর বলতে সাধারণভাবে সেই স্থানকে বোঝায় যেখানে চিঠিপত্র জমা হয়, বাছাই করা হয় এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, ডাক আদান-প্রদানের কেন্দ্রই হলো ডাকঘর।
সাহিত্যের একটি প্রধান অঙ্গ হল নামকরণ। প্রসঙ্গত বলা যায় যে নামকরণের মাধ্যমেই রচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে আগাম ধারণা করা যায়। নামকরণ বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে। যেমন-বিষয়কেন্দ্রিক, চরিত্রপ্রধান, ব্যঞ্জনাধর্মী ইত্যাদি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকের নামকরণটি বিশেষ তাৎপর্যবাহী। ‘ডাকঘর’ উচ্চারণের সাথে সাথে মনে পড়ে চিঠি, ডাকঘর ও ডাক-হরকরা শব্দবন্ধগুলি। অমলের কাছে রাজার চিঠি আসা ও শেষে স্বয়ং রাজার আসা দুটিই বিশেষ তাৎপর্যময়। নাটকে রাজা হচ্ছেন বিশ্বের রাজা অর্থাৎ বিশ্বেশ্বর। চিঠির মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের কাছে তাঁর সংবাদ জানান দেন, ইঙ্গিত দেন, অন্যকে আহ্বান জানান। রাজার চিঠির আশায় মানুষ উৎকণ্ঠিত হয়ে থাকেন। অমলও রাজার চিঠির আকাঙ্ক্ষা করেছে।
এই নাটকে সমগ্র বিশ্বই ভগবানের ডাকঘর, এখানেই বিশ্বরাজের সমস্ত সৌন্দর্যের বার্তা একত্রিত হয়। চিঠিগুলি মূলত মানুষের অন্তরের বিবেক জাগানোর উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। আর ডাক-হরকরার কাজ হল চিঠি বিলি করা। রাজার চিঠির তারাই বাহক বা দূত। পৃথিবীর যা কিছু অপূর্ব সৌন্দর্য প্রকাশ তার মধ্যেই ভগবানের বার্তা থাকে। যারা রূপ ও রসের মাধ্যমে রাজার আনন্দরূপ মানুষের কাছে ফুটিয়ে তোলে, তারাই ডাক-হরকরা। অমলের ইচ্ছা সে রাজার ডাক-হরকরা হবে, রাজার আনন্দলিপি দিকে দিকে বয়ে নিয়ে বেড়াবে, রাজার সৌন্দর্য প্রচারে সে সহায়ক হবে।
‘ডাকঘর’-এ স্বদেশ ও সমকালও উপস্থিত। রাজার আগমন বলতে তৎকালীন ইংরেজ শাসক রাজা পঞ্চম জর্জ নাটকটি প্রকাশের কিছুদিন আগেই ভারতে এসেছিলেন। সেজন্য ‘ডাকঘর’ শুধু বস্তুবাচক নয়, পাশাপাশি মানুষের অন্তরাত্মার মুক্তির বাণীও সেখান থেকে প্রকাশিত। সেজন্য ‘ডাকঘর’ নাটকটির ব্যঞ্জনাধর্মী নামকরণ হিসেবে সার্থক হয়েছে বলা যায়।
৫। দুটি প্রশ্নের মধ্যে যে-কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও (অনধিক ১৫০ শব্দে) :
(A) বাংলা চিত্রকলার ইতিহাসে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।
উত্তর : - অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্র অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন নব্যবঙ্গীয় চিত্ররীতির জনক তথা আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার পথপ্রদর্শক।
চিত্ররীতির প্রচার ও প্রসার: পাশ্চাত্য চিত্ররীতির প্রতি আকর্ষণে অবনীন্দ্রনাথ ইতালীয় শিল্পী গিলার্ডি, ইংরেজ শিল্পী পামার এবং জাপানি শিল্পী টাইকানের কাছে প্রথাগত ও নিয়মানুগ চিত্ররীতির শিক্ষা গ্রহণ করেন। শিল্পচর্চার প্রথম পর্যায়ে ড্রয়িং, প্যাস্টেল, অয়েল পেন্টিং, জলরং বিবিধ মাধ্যমে চিত্রাঙ্কন করেন। এরপর আইরিশ ইল্যুমিনেশন ও মোগল মিনিয়েচারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ফলে তাঁর শিল্পীসত্তায় দোলাচলতা দেখা দেয়। রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে বৈঘ্নব পদাবলিকে বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে তিনি আত্মবিকাশের পথ খুঁজে পান। চিত্রকলার জগতে প্রাচ্য শিল্পরীতিকে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছিলেন অবনীন্দ্রনাথ। শুধু চিত্র অঙ্কনই নয় শিল্পকলার বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান ও আগ্রহ বৃদ্ধি করার জন্য, তার যথাযথ প্রচারের জন্য কয়েকজন গণ্যমান্য বাঙালি ও ইংরেজ শিল্পরসিককে একত্রিত করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট’।
শিল্পরীতির বৈশিষ্ট্য: জলরঙে ‘ওয়াশ’ পদ্ধতিতে ছবি আঁকার মাধ্যমে প্রকাশ ছবিকে বারবার ধুয়ে নতুন রূপ দিতেন অবনীন্দ্রনাথ। এ ছাড়া তাঁর ছবিতে পায় তাঁর শিল্পচর্চার দক্ষতা। যা জাপানি ‘ওয়াশ’ পদ্ধতির থেকে আলাদা। মোগল মিনিয়েচারের প্রভাবও ছিল। তাঁর ছবির মূল প্রাণশক্তি ছিল অনুভূতি গ্রাহ্যতা, যা রঙের পেলব ব্যবহারে বাত্ময় হয়ে উঠত।
শ্রেষ্ঠ চিত্রকলা: বৈঘ্নব পদাবলিকেন্দ্রিক বিখ্যাত চিত্র ‘শ্বেত অভিসারিকা’-র পাশাপাশি ‘কৃষ্ণলীলা সিরিজ’, ‘কচ ও দেবযানী’, ‘ভারতমাতা’, ‘অশোকের রানি’, ‘দেবদাসী’, ‘অন্তিম শয্যায় শাহজাহান’ প্রভৃতি চিত্রগুলিও তাঁর উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি।
(B) তথ্যচিত্র কাকে বলে? বাংলা তথ্যচিত্রের ধারা সম্বন্ধে যা জানো লেখো। (২+৩)
উত্তর : - তথ্যচিত্র হলো সেই চলচ্চিত্র যেখানে কাহিনী থাকে না বরং তত্ত্বের প্রধান থাকে। বাংলা তথ্যচিত্রের ধারাটি ও বেশ সমৃদ্ধ। বাংলা তথা ভারতের চলচ্চিত্র শিল্পের আদিপুরুষ হীরালাল সেনের হাত ধরেই বাংলা তথ্যচিত্র জন্ম হয়েছিল। তাঁর 'দিল্লি দরবার' কোন কাহিনীচিত্র ছিল না বরং তথ্যচিত্র ছিল। তবে সার্থক তথ্যচিত্র তৈরি হয়েছিল আরো বহু পরে- দেশ স্বাধীন হওয়ার পর।
নিচে কয়েকজন বাঙালি তথ্যচিত্রকার এবং তাদের কাজের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হল-
১) হরিসাধন দাশগুপ্তঃ তিনি বিভিন্ন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার জন্য কয়েকটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- কোণার্ক, বাবা, আচার্য নন্দলাল, মিজোরাম প্রভৃতি।
২) সত্যজিৎ রায়ঃ কাহিনীচিত্রের পাশাপাশি সত্যজিৎ রায় পাঁচটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন। সেগুলি হল- Rabindranath Tagore, © The Inner Eye, Bala, Sikkim এবং সুকুমার রায়।
৩) ঋত্বিক ঘটকঃ তাঁর উল্লেখযোগ্য তথ্যচিত্র গুলি হল 'আমার লেনিন', 'ইয়ে কিউ', 'আদিবাসিও কা জীবন স্রোত', রামকিঙ্কর প্রভৃতি।
৪) চিদানন্দ দাশগুপ্তঃ তাঁর প্রথম তথ্যচিত্রটি কলকাতা বিষয়ক 'পোর্ট্রেট অফ এ সিটি'। এছাড়াও 'বিরজু মহারাজ', 'দি ড্যান্স অফ শিবা' প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য তথ্যচিত্র।
৫) মৃণাল সেনঃ তাঁর উল্লেখযোগ্য তথ্যচিত্রগুলি হল মুভিং পার্সপেক্টিভ', 'ত্রিপুরা প্রসঙ্গ', 'ক্যালকাটা মাই এল ডোরাডো প্রভৃতি।
অন্যান্য বাংলা তথ্যচিত্রকরদের মধ্যে বিমল রায়, গৌতম ঘোষ, পূর্ণেন্দু পত্রী, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বিভাগ – খ
(১০ নম্বরের প্রশ্ন) ১ × ১০ = ১০
নিম্নলিখিত যে-কোনো একটি বিষয় নির্বাচন করে, নির্দেশ অনুসারে কমবেশি ৪০০ শব্দে একটি প্রবন্ধ রচনা করো।
(A) প্রদত্ত অনুচ্ছেদটিকে প্রস্তাবনা বা ভূমিকাস্বরূপ গ্রহণ করে বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করে, পরিণতিদানের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ রচনা করো :
পরিবেশ ও বিপন্ন মানুষ
বিগত শতাব্দীর দুটি বিশ্বযুদ্ধ এবং সেইসঙ্গে শিল্পবিপ্লবের কল্যাণে মানবজীবনে নানা উন্নতি সত্ত্বেও আমাদের শান্তি অনেকখানি বিঘ্নিত হয়েছে। তাই কবিকে আক্ষেপের সুরে বলতে হয়েছে — “দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর।” স্বার্থের সংঘাত, লোভের অপরিমিত স্বভাব, ভ্রাতৃদ্বন্দ্ব, অনৈক্যের চোরাবালি, ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ ভারতের সমস্যাকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যার জন্য দেখা দিয়েছে আয় ও সম্পদের ক্ষেত্রে বৈষম্য। এই বৈষম্যের ফলে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ও স্বাচ্ছন্দ্য যেমন বিঘ্নিত হয়েছে, তেমনি নষ্ট হয়েছে বাস্তুতন্ত্র ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য। ফলে বর্তমানে পরিবেশের যে পরিবর্তন দেখা দিয়েছে, তাতে পৃথিবীর মানুষ বিপন্নতায় আক্রান্ত। তাই তার সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাও প্রকট হয়ে উঠেছে।
উত্তর : - পরিবেশ ও বিপন্ন মানুষ
বিগত শতাব্দীর দুটি বিশ্বযুদ্ধ এবং শিল্পবিপ্লব মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে মানুষের জীবনযাত্রা যেমন সহজ ও আরামদায়ক হয়েছে, তেমনি প্রকৃতির ওপর বেড়েছে অযাচিত হস্তক্ষেপ। তাই কবির কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে আক্ষেপ— “দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর।” এই আকুতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে আধুনিক সভ্যতার নির্মম বাস্তবতা।
স্বার্থের সংঘাত, লোভের সীমাহীন বিস্তার এবং অনিয়ন্ত্রিত ভোগবাদী মানসিকতা প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করেছে। বনভূমি উজাড় করে নগরায়ণ, শিল্পকারখানার ধোঁয়া, যানবাহনের বিষাক্ত গ্যাস, নদী দূষণ— সব মিলিয়ে পরিবেশ আজ সংকটাপন্ন। ঔপনিবেশিক শাসন ও পরবর্তী অর্থনৈতিক বৈষম্য উন্নয়নের নামে প্রাকৃতিক সম্পদের নির্বিচার শোষণকে ত্বরান্বিত করেছে। ফলে একদিকে যেমন ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বেড়েছে, অন্যদিকে বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক চক্র ভেঙে পড়েছে।
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, গ্লোবাল ওয়ার্মিং, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। গ্রীষ্মের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে, শীতকাল সংক্ষিপ্ত হচ্ছে, কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশের এই বিপর্যয় মানুষের স্বাস্থ্যেও প্রভাব ফেলছে— শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, জলবাহিত রোগ প্রভৃতি বাড়ছে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ। বৃক্ষরোপণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র— সকলের সম্মিলিত উদ্যোগেই পরিবেশ রক্ষা সম্ভব।
অতএব, পরিবেশ রক্ষা মানেই মানবসভ্যতার রক্ষা। প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই টেকসই উন্নয়নের একমাত্র পথ। আজ যদি আমরা সচেতন না হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক বিপন্ন পৃথিবী উপহার দিতে হবে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ কেবল কর্তব্য নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার অঙ্গীকার।
(B) প্রদত্ত সূত্র ও তথ্য অবলম্বনে একটি প্রবন্ধ রচনা করো :
সমরেশ বসু
• জন্ম : ১১ ডিসেম্বর, ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান বাংলাদেশের বিক্রমপুরে। কৈশোর অতিবাহিত হয় কলকাতার উপকণ্ঠে নৈহাটিতে।
• পিতৃদত্ত নাম : সুরথনাথ বসু।
• পিতা : মোহিনীমোহন বসু।
• মাতা : শৈবলিনী বসু।
• বিচিত্র সব অভিজ্ঞতায় জীবন ছিল ভরপুর।
• একসময় মাথায় ফেরি করে ডিম বিক্রি। পরে ইছাপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টরিতে চাকরি। এই পর্বে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া।
• জেলখানায় বসে লেখা প্রথম উপন্যাস।
• কালকূট ও ভ্রমর ছদ্মনামে লেখা উপন্যাস।
• বিখ্যাত উপন্যাস : ‘বি.টি রোডের ধারে’, ‘গঙ্গা’, ‘বিবর’, ‘প্রজাপতি’।
কিশোর উপন্যাস : ‘মোক্তার দাদুর কেতুবধ’, ‘জোনাকি ভূতের বাড়ি’।
• ছোটদের জন্য তাঁর সৃষ্ট গোয়েন্দা ‘গোগোল’ অত্যন্ত জনপ্রিয়।
• পুরস্কার : আনন্দ পুরস্কার, সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার।
• ‘হোমসিয়ানা’ ক্লাবের নিয়মিত সদস্য।
• মৃত্যু : ১২ই মার্চ, ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ।
উত্তর : -
জন্ম ও বংশ পরিচয় : - দিনটা ১৯২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর। বর্তমান বাংলাদেশের বিক্রমপুরের মোহিনীমোহন বসু এবং শৈবলিনী দেবীর ঘরে জন্ম নিল ফুটফুটে পুত্রসন্তান, পারিবারিক সূত্রে তার নাম রাখা হল সুরথনাথ।
কর্মজীবন ও কালকূট হয়ে ওঠার কাহিনী : - কিন্তু কে জানতো, বড়ো হয়ে এই ছেলেই সমস্ত পারিবারিক টানকে অগ্রাহ্য করে বেরিয়ে পড়বে প্রকৃতি এবং বিচিত্র মানুষের সঙ্গ পেতে। মানবসভ্যতার গরলকে নিজের কলমে ধারণ করে কখনও সে হয়ে উঠবে 'কালকূট' কখনও আবার সম্পর্কের মধুসন্ধানী 'ভ্রমর' যে প্রয়োজনে ব্যঙ্গের হুল ফুটাতেও দ্বিধা করে না। নিজের লেখনীর মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের দিক পরিবর্তনের অন্যতম কান্ডারি সুরথনাথ নিজের নামেও এনেছিলেন বদল। লেখক সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাসের নায়কের নাম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন তিনি, পরবর্তীকালে লেখক ও পাঠক-মহলে সমাদৃত হয়েছিলেন সমরেশ বসু নামে।
বাউন্ডুলে জীবন : - তবে সুরথনাথ থেকে প্রখ্যাত কথাকার সমরেশ বসু হয়ে ওঠার যাত্রাপথটা মোটেই সুখকর ছিল না। পুড়াশুনায় অমনোযোগের কারণে ১৯৩৮ সালে প্রিয় বুড়িগঙ্গার তীর, শ্মশানঘাট, বন্ধুবান্ধব ছেড়ে তাকে চলে আসতে হল দাদার কাছে- ২৪ পরগণার নৈহাটিতে। পড়াশুনায় উৎসাহ না থাকলেও বাঁশি বাজানো, ছবি আঁকা, অভিনয়ে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। আপাদমস্তক প্রেমিকসত্তার অধিকারী সমরেশ নবম শ্রেণিতেই স্কুল চৌহদ্দি ছেড়ে প্রকৃতির পাঠশালার দ্বারস্থ হলেন, বন্ধুরা যখন দশম শ্রেণির পড়া নিয়ে ব্যস্ত তখন সমরেশ স্বামীবিচ্ছিন্না গৌরীদেবীকে নিয়ে নৈহাটি ছেড়ে আতপুরের এক বস্তিতে গিয়ে উঠলেন, পেটের দায়ে সবজি, ডিম বিক্রি এবং স্ত্রী গৌরীদেবীর সংগীতচর্চার মাধ্যমে জোগাড় হতে লাগল সংসার খরচ।
রাজনীতিতে প্রবেশ : - এমতাবস্থায় জগদ্দল অঞ্চলের শ্রমিক নেতা সত্যপ্রসন্ন দাশগুপ্ত তাঁকে পোস্টার লেখার দায়িত্ব দেন এবং ইছাপুর বন্দুক কারখানাতে সমরেশের একটি চাকরিও জুটে যায়। ততদিনে তাঁর মার্কসবাদী মতাদর্শে হাতে খড়ি হয়েছে, সংসারে এসেছে সন্তান, বস্তি থেকে উত্তরণ ঘটেছে কারখানার শ্রমিকদের পাড়ায়। সমরেশ তখন স্বপ্ন দেখছেন শোষণহীন সমাজব্যবস্থার। তবে রাজনীতিতে অতিসক্রিয়তার দরুন তাঁকে কারাবরণও করতে হয়।
সাহিত্য সেবায় সমরেশ : - প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি অবস্থায় তিনি লিখতে শুরু করেন 'উত্তরঙ্গ'। মোটামুটি ১৯৫১ সালের কাছাকাছি সময়ে জেল থেকে মুক্তি পান, চাকরি থেকে বরখাস্ত হন, কমিউনিস্ট পার্টির পাঁচ বছরের সদস্যপদ 'ত্যাগ করেন এবং সর্বোপরি পূর্ণ সময়ের জন্য লেখালেখিকেই জীবিকা
হিসেবে বেছে নেন যে জীবন ছিল সম্পূর্ণভাবে অনিশ্চিত। তবে সংগঠনকে ছাড়লেও সংগ্রামী মানসিকতাকে তিনি আজীবন সঙ্গে রেখেছেন। তার প্রমাণ 'জগদ্দল', 'গঙ্গা', 'শিকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে', 'মহাকালের রথের ঘোড়া', 'বি টি রোডের ধারে' (রাজনৈতিক শিক্ষাগুরু সত্যপ্রসন্ন দাশগুপ্ত ওরফে 'সত্য মাস্টার'-কে উৎসর্গ করে) প্রভৃতি উপন্যাস। এর সঙ্গে সঙ্গে তিনি রচনা করলেন 'বিবর', 'প্রজাপতি'-র মতো তথাকথিত অশালীন, বিতর্কিত উপন্যাসও যা মানবমনের অবদমিত যৌনচেতনাকে ব্যক্ত করেছিল; ভাষা এবং মনস্তত্ত্ব নিয়ে পরীক্ষামূলক এই উপন্যাসদ্বয় একাধারে নিন্দিত এবং নন্দিতও বটে। তাঁর পাশে সেই সময় সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু-সহ অনেকেই ছিলেন। তাঁর প্রকাশিত ছোটোগল্পের সংখ্যা প্রায় ২০০- তার মধ্যে সর্বাপেক্ষা আলোচিত হল তাঁর রচিত প্রথম ছোটোগল্প 'আদাব'। এ ছাড়াও 'মরশুমের একদিন', ‘ছেঁড়া তমসুক', 'জোয়ার ভাটা', 'আলোয় ফেরা', 'উজান' প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পসংকলন। 'কালকূট' ছদ্মনামে 'অমৃতকুম্ভের সন্ধানে, – 'কোথায় পাব তারে', 'বাণীধ্বনি বেণুবনে', 'নির্জন সৈকতে', 'স্বর্ণশিখর { প্রাঙ্গণে' প্রভৃতি ভ্রমণমূলক এবং বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে মেলামেশার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ গ্রন্থ রচনা করেন তিনি। পিছিয়ে পড়া মানুষের সংগ্রামের কথাকে পৌরাণিক আবহে প্রকাশ করেছেন কালজয়ী উপন্যাস 'শাম্ব'-তে।
- এ ছাড়াও 'ভ্রমর' ছদ্মনামে সমরেশ যুদ্ধের শেষ সেনাপতি', 'প্রভু, কার হাতে তোমার রক্ত', 'প্রেম কাব্য রক্ত' ইত্যাদি রচনায় বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন।
ছোটোদের সমরেশ : - সমরেশ কেবল পরিণত পাঠকদের কথাই ভাবেননি, ছোটদের জন্যও তিনি সৃষ্টি করেছিলেন 'গোয়েন্দা গোগোল' চরিত্র যা কিশোর সাহিত্যে এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন। কেবল পুস্তকের গণ্ডিতে সমরেশের সাহিত্যপ্রতিভা সীমাবদ্ধ হয়ে থাকেনি, তা জনপ্রিয়তা পেয়েছে রূপোলি পর্দাতেও। তাঁর ছোটোগল্প এবং উপন্যাস নিয়ে বাংলা, হিন্দি-সহ বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় চলচ্চিত্র, স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবি নির্মিত হয়েছে। রাজেন তরফদার থেকে গুলজার পর্যন্ত বহু পরিচালক, চিত্রনাট্যকাররা তাঁর সাহিত্য নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন এবং সেগুলি নানা বিভাগে পুরস্কৃতও হয়েছে। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি শিল্পী রামকিঙ্কর বেইজ-কে নিয়ে 'দেখি নাই ফিরে' উপন্যাস লেখার কাজ শুরু করেছিলেন যার কয়েকটি পর্ব 'দেশ' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
সম্মাননা ও মৃত্যু : - তাঁর কালজয়ী উপন্যাস 'শাম্ব'- এর জন্য তিনি 'সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৯৩ সালে এই অসমাপ্ত উপন্যাসের জন্য তিনি মরণোত্তর 'আনন্দ পুরস্কার' লাভ করেন।
তাঁর মৃত্যুর পর কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ে লিখেছিলেন
‘রাজকীয় মর্জি ছিলো চরিত্রে তোমার'
১৯৮৮ সালের ১২ মার্চ সমরেশের মৃত্যুতে সত্যিই বাংলা সাহিত্যজগতে ইন্দ্ৰপতন ঘটেছিল।
শতবর্ষে সমরেশ ও প্রাসঙ্গিকতা : - তবে মেহনতি মানুষের শ্রমে আজও অমর তিনি, জন্মের একশো বছর পরেও বাঙালি তথা ভারতীয়ের আত্ম অনুসন্ধানের পথে পাথেয় হয়ে রয়েছে 'কালকূট'-এর লেখা। শিশু- কিশোরদের রহস্যময়তার জগতে আজও তাদের সঙ্গী গোয়েন্দা গোগোল'। তাঁর জন্মশতবর্ষেও তাঁর সাহিত্যসম্ভার একই রকম প্রাসঙ্গিক এবং কালোত্তীর্ণ সে কথা বলাই বাহুল্য।


Enter Your Comment