West Bengal Class 7 Environment & Science Chapter 1.1 Heat Complete Notes
ক্লাস VII পরিবেশ ও বিজ্ঞান অধ্যায় ১ তাপ
তাপের উৎপত্তি : -
প্রকৃতপক্ষে তাপের উৎস নিহিত থাকে পদার্থের অণু–পরমাণুর অন্তর্নিহিত এলোমেলো গতিতে। প্রতিটি পদার্থের অণু সর্বদা গতিশীল—কখনো কম, কখনো বেশি। কোনো পদার্থে সঞ্চিত মোট তাপের পরিমাণ তার অণুগুলোর মোট গতিশক্তির সঙ্গে সমানুপাতিক।
যখন কোনো বস্তুকে তাপ প্রদান করা হয়, তখন তার অণুগুলোর গতিবেগ বৃদ্ধি পায়; অণুগুলোর এই বর্ধিত গতিশক্তিই তাপ হিসেবে প্রকাশ পায়। আর এই আণবিক গতির তারতম্যই আমাদের কাছে গরম বা ঠান্ডার অনুভূতি সৃষ্টি করে।
অতএব বলা যায়, তাপ কোনো দৃশ্যমান বস্তু নয়; এটি পদার্থের অণুগত গতির ফলস্বরূপ উদ্ভূত এক মৌলিক শক্তির রূপ।
তাপ : - তাপ (Heat) হলো এক ধরনের শক্তি, যা উষ্ণ বস্তু থেকে শীতল বস্তুর দিকে প্রবাহিত হয়। তাপের কারণে কোনো বস্তুর তাপমাত্রা বাড়ে বা কমে, আবার কখনও বস্তুর অবস্থার পরিবর্তন (কঠিন–তরল–গ্যাস) ঘটতে পারে।
একক :—
তাপের এসআই(SI) একক হলো জুল (Joule)।
তাপের সিজিএস(CGS) একক হলো ক্যালরি (Calorie)।
সম্পর্ক : ১ ক্যালোরি = ৪.২ জুল
তাপ স্থানান্তরের পদ্ধতি:
তাপ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হয় তিনটি প্রধান পদ্ধতিতে:
১. সংবহন (Conduction):
কঠিন বস্তুর মধ্যে কণা থেকে কণায় তাপ সঞ্চালিত হওয়াকে পরিবহণ বলে।
উদাহরণস্বরূপ, যখন একটি ধাতুর চামচ গরম জলের মধ্যে রাখা হয়, তখন ধাতু চামচ গরম হয়ে ওঠে। এই তাপ সরাসরি ধাতুর অণুর মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়।
উদাহরণ: লোহার দণ্ডের এক প্রান্ত গরম করলে অন্য প্রান্তও গরম হয়ে যায়।
২. সংবহন (Convection):
তরল ও গ্যাসে কণার চলাচলের মাধ্যমে তাপ সঞ্চালিত হলে তাকে সংবহন বলে।
সংবহন তখন ঘটে যখন তাপের কারণে তরল বা গ্যাসের অণু বা কণার গতির পরিবর্তন হয় এবং তা তাপকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যায়। এটি সাধারণত তরল বা গ্যাসের মধ্যে ঘটে। উদাহরণ: ফুটন্ত জলে নিচের গরম জল ওপরে উঠে আসে।
৩. তড়িৎ বিকিরণ (Radiation):
তাপ বিকিরণ হলো তাপের স্থানান্তর যার মাধ্যমে তাপ কোনো মাধ্যম ছাড়াই, অর্থাৎ বাতাস বা অন্য কোনো পদার্থ ছাড়াই, তড়িৎ তরঙ্গের মাধ্যমে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যায়। সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসা তাপের স্থানান্তর তড়িৎ বিকিরণের মাধ্যমে ঘটে।
উদাহরণ: সূর্যের তাপ পৃথিবীতে পৌঁছানো।
তাপের প্রকারভেদ : -
প্রধানত তিন প্রকার- ১) বোধগম্য তাপ ২) লীন তাপ ও ৩) বিকীর্ণ তাপ।
১) বোধগম্য তাপ (Sensible Heat) : -
যে তাপ গ্রহণ বা ত্যাগ করলে কোনো পদার্থের তাপমাত্রা পরিবর্তিত হয়, কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন ঘটে না, তাকে বোধগম্য তাপ বলে।
যেমন—জল গরম করলে তার তাপমাত্রা বাড়ে, কিন্তু জল জলই থাকে।
২) লীন তাপ (Latent Heat) : -
তাপ প্রয়োগ করলে পদার্থের অণু বা পরমাণুগুলোর গতিবেগ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে কণাগুলোর মধ্যে দূরত্ব বাড়ে এবং পদার্থের অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। তাপের প্রভাবে কঠিন পদার্থ তরলে, তরল পদার্থ গ্যাসে রূপান্তরিত হয়। আবার তাপ অপসারণ করলে গ্যাস তরল ও তরল কঠিনে পরিণত হতে পারে। অর্থাৎ, তাপ পদার্থের কণার গতি ও বিন্যাস পরিবর্তন করে, যার ফলে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে।
লীন তাপ হলো সেই তাপশক্তি, যা পদার্থের অবস্থার পরিবর্তনের সময় শোষিত বা নির্গত হয়, কিন্তু এতে তাপমাত্রার কোনো পরিবর্তন ঘটে না।
যেমন—বরফ গলতে বা জল বাষ্পে পরিণত হতে তাপ লাগে, কিন্তু তাপমাত্রা অপরিবর্তিত থাকে।
লীন তাপ চার প্রকার। যথা-
(১) গলনের লীন তাপ: উষ্ণতা স্থির রেখে কোন কঠিন পদার্থকে তরলে পরিণত করতে যে পরিমাণ তাপের প্রয়োজন সেই পরিমান তাপকে ঐ পদার্থের গলনের লীন তাপ বলে। জলের গলনের লীন তাপ CGS পদ্ধতিতে 80 ক্যালোরি / গ্রাম।
(২) বাষ্পীভবনের লীন তাপ: উষ্ণতা স্থির রেখে কোন তরল পদার্থকে বাষ্পে পরিণত করতে যে পরিমাণ তাপের প্রয়োজন সেই পরিমান তাপকে ঐ পদার্থের বাষ্পীভবনের লীন তাপ বলে।জলের বাষ্পীভবনের লীন তাপ CGS পদ্ধতিতে 537 ক্যালোরি / গ্রাম।
(৩) তরলীভবনের লীন তাপ: উষ্ণতা স্থির রেখে কোন গ্যাসীয় বা বাষ্পীয় পদার্থকে তরলে পরিণত করতে যে পরিমাণ তাপের প্রয়োজন সেই পরিমান তাপকে ঐ পদার্থের তরলীভবনের বা ঘনীভবনের লীন তাপ বলে। জলের ঘনীভবনের লীন তাপ CGS পদ্ধতিতে 537 ক্যালোরি / গ্রাম।
(৪) কঠিনীভবনের লীন তাপ: উষ্ণতা স্থির রেখে কোন তরল পদার্থকে কঠিনে পরিণত করতে যে পরিমাণ তাপের প্রয়োজন সেই পরিমান তাপকে ঐ পদার্থের কঠিনীভবনের লীন তাপ বলে।জলের কঠিনীভবনের লীন তাপ CGS পদ্ধতিতে 80 ক্যালোরি / গ্রাম।
৩) বিকীর্ণ তাপ (Radiant Heat) : -
যে তাপ কোনো মাধ্যম ছাড়াই তরঙ্গের মাধ্যমে সঞ্চালিত হয়, তাকে বিকীর্ণ তাপ বলে।
যেমন—সূর্যের তাপ পৃথিবীতে পৌঁছানো বা আগুনের পাশে দাঁড়ালে গরম লাগা।
তাপ মাপার যন্ত্রের নাম : -
যে যন্ত্রের সাহায্যে তাপের পরিমাণ নির্ণয় করা হয় তার নাম ক্যালরিমিটার।
আপেক্ষিক তাপ [Specific heat]:-
কোনো পদার্থের একক ভরের উষ্ণতা এক ডিগ্রি বৃদ্ধি করতে যে পরিমাণ তাপের প্রয়োজন হয়, তাকে ওই পদার্থের আপেক্ষিক তাপ বলে।
তাপমাত্রা বা উষ্ণতা : - উষ্ণতা হলো এক প্রকার তাপীয় অবস্থা, যা তাপের প্রবাহের দিক নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ, তাপের আদান-প্রদানের সময় কোন বস্তু তাপ গ্রহণ করবে এবং কোন বস্তু তাপ ত্যাগ করবে, তা বস্তুদ্বয়ের উষ্ণতার উপর নির্ভর করে। তাপের মতো উষ্ণতারও কোনো নির্দিষ্ট অভিমুখ নেই, তাই উষ্ণতাও একটি স্কেলার রাশি।
একক :
CGS পদ্ধতিতে উষ্ণতার একক: ডিগ্রি সেলসিয়াস (°C) / ডিগ্রি ফরহেনহাইট (°F)
SI পদ্ধতিতে উষ্ণতার একক: কেলভিন (K)
ডিগ্রি সেলসিয়াস (°C) এবং ডিগ্রি ফারেনহাইট (°F) এককের পাঠ : -
ডিগ্রি সেলসিয়াস (°C)
সেলসিয়াস স্কেলে, জল গলনবিন্দু বা নিন্মস্থিরাঙ্ক 0°C এবং জল সিদ্ধবিন্দু বা ঊর্ধ্বস্থিরাঙ্ক 100°C ধরা হয়। সাধারণ অন্তর = 100°C - 0°C = 100°C
ডিগ্রি ফারেনহাইট (°F)
ফারেনহাইট স্কেলে, জল গলনবিন্দু বা নিন্মস্থিরাঙ্ক 32°F এবং জল সিদ্ধবিন্দু বা ঊর্ধ্বস্থিরাঙ্ক 212°F ধরা হয়। সাধারণ অন্তর = 210°C - 32°C = 180°C
সেলসিয়াস ও ফারেনহাইট স্কেলের মধ্যে সম্পর্ক : -
সেলসিয়াস স্কেলের 100 ঘর ফারেনহাইট স্কেলের 180 ঘরের সমান।
সেলসিয়াস স্কেলের 1 ঘর ফারেনহাইট স্কেলের 180 / 100 ঘরের সমান।
সেলসিয়াস স্কেলের C ঘর ফারেনহাইট স্কেলের 180 C/ 100 ঘরের সমান।
তাহলে লেখা যায় ,
80 C/ 100 = F - 32
বা, 9C/ 5 = F - 32
বা, C/ 5 = (F - 32) / 9
বা, C = 5 / 9 (F - 32)
গণিত সমস্যা : -
প্রশ্ন ১) 40°C কত ডিগ্রি ফারেনহাইটের সমান ?
জীবের আকৃতি, প্রকৃতি ও জীবনযাত্রায় তাপ ও উষ্ণতার প্রভাব : -
জীবজন্তুর শরীরের আকৃতি, তাদের বহির্মুখী বৈশিষ্ট্য এবং জীবনধারা (যেমন খাবার খাওয়া, বিশ্রাম নেওয়া বা উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ) তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাণী ও মানুষ তাদের পরিবেশ অনুযায়ী দেহকে অভিযোজিত করে। শীতপ্রধান অঞ্চলে প্রাণীদের দেহে বিশেষ ধরনের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, যা তাদের শরীরকে উষ্ণ রাখে। উদাহরণস্বরূপ, শীতপ্রধান অঞ্চলের কুকুর বা হরিণের দেহে ঘন লম্বা লোম থাকে, যা শরীরের তাপ বজায় রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের কুকুরের লোম তুলনামূলকভাবে কম, কারণ তাদের দেহকে অতিরিক্ত গরম থেকে রক্ষা করতে হয়।
একইভাবে, মানুষের দেহেও তাপের প্রভাব দেখা যায়। গরমের দিনে মানুষের দেহ ঘাম উৎপন্ন করে, যা বাষ্পীভবনের মাধ্যমে শরীরকে ঠান্ডা রাখে। কিন্তু প্রাণীদের ক্ষেত্রে কুকুরের মতো প্রাণী তাদের শরীর ঠান্ডা রাখার জন্য লালা ঝরায়। কুকুরের জিভ থেকে লালা পড়া এবং বালিতে উষ্ণায়ন সহ্য করার ক্ষমতা এই ধরনের অভিযোজনের উদাহরণ।
শীতপ্রধান অঞ্চলের প্রাণীর আরও উদাহরণ হলো মেরু ভালুক। মেরু ভালুকের দেহে ঘন লম্বা লোম থাকে, যা শীতকালে শরীরকে গরম রাখে। পেঙ্গুইনের দেহেও ঘন লোম বা পাখা থাকে, যা তাদের ঠান্ডা জল ও বরফের মধ্যে দেহকে গরম রাখে।
অন্যদিকে, গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের প্রাণীরা যেমন গিরগিটি বা সাপ – ঠান্ডা রক্তের প্রাণী, তারা নিজেদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সরাসরি সূর্যের রোদ নেয়। রোদে থাকা বা ছায়ায় যাওয়া তাদের দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের একটি প্রাকৃতিক পদ্ধতি।
এই সমস্ত উদাহরণ প্রমাণ করে যে, তাপ এবং উষ্ণতা জীবের আকৃতি, শরীরের কাঠামো এবং জীবনযাত্রার প্যাটার্নকে সরাসরি প্রভাবিত করে। অন্য কথায়, যে পরিবেশে তাপমাত্রা বেশি বা কম, সে অনুযায়ী প্রাণী ও মানুষের দেহে অভিযোজন ঘটে।


Enter Your Comment